চারিদিকে নীল জলরাশি আর মাঝখানে ছোট্ট দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। টেকনাফ থেকে নাফ নদী ধরে জাহাজ যখনই সমুদ্রে প্রবেশ করে নীলের আবেশে প্রবেশ করি আমরাও। অপূর্ব সেই রঙ, একবার দেখলে ভুলে যাবার নয়। বরং তার ডাকে বার বার ছুটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমি এর আগেও একবার এসেছিলাম তখনও বলেছিলাম আবার আসবো।

কিন্তু এবারের আসাটা একটু অন্যরকম, ব্যচেলার জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে বিবাহিত জীবনে পদার্পণ। সহকর্মী ভাইদের উপহার হিসেবে পাওয়া হানিমুন ট্রিপ। এক্সট্রিম ট্র্যাভেলারস এর সাথে এটাই প্রথম ট্যুর ছিল আমাদের। আমার সহধর্মিণী সুফিয়া হাসান খুবই উচ্ছ্বাসিত ছিল এই ট্যুর নিয়ে।

এক্সট্রিম ট্র্যাভেলারস থেকে ট্যুর এর তারিখ নির্ধারণ করা হল ৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ই ফেব্রুয়ারি। ৬ তারিখ অফিস শেষ করে বিকালের দিকে টেকনাফ যাওয়ার বাসে উঠবো বলে সায়দাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম । এই ট্যুরে আমাদের সাথে আমার পুরাতন-বর্তমান সহকর্মীর পাশা পাশি এক্সট্রিম ট্র্যাভেলারস এর কিছু অন্য সদস্য ছিল যারা আমাদের ট্যুরের সহযাত্রী ছিলেন।

সায়দাবাদ গিয়ে টেকনাফের বাসে উঠলাম। এই ট্যুরে আমরা ছিলাম ১৭জন। সারারাত বাসের জার্নি শেষ করে আমরা সকাল ৯টায় টেকনাফ লঞ্চ ঘাটে পৌছালাম। তারপর আমরা লঞ্চে উঠে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পৌছালাম। তখন দুপুর ১টা বাজে। আমরা রিসোর্টে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চটা সেরে ফেললাম। সূর্যঅস্ত দেখার জন্য দ্বীপের পশ্চিম দিকের সুমুদ্র পাড়ে গেলাম।

সবাই মিলে অনেক মজা করছিলাম আমার পুরাতন সহকর্মীদের পেয়ে আমি তো আড্ডায় মেতে উঠি। কিছু মুহূর্তের জন্য আমি ভুলে যাই আমি বিবাহিত, বউ নিয়ে এখানে হানিমুনে এসেছি। আমাকে বিরক্ত না করে, সে একটু দূরে একা একা সুমুদ্র পাড়ে হাঁটছিল, আর সূর্য অস্ত যাওয়ার দৃশ দেখছিল। আর আমরা সবাই ছবি তোলাতে ব্যস্ত ছিলাম।

একটু পর রায়হান ভাই মজা করে বললো এই হাসান ভাইয়ের বউ হারিয়ে গিয়েছে, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আচমকা বুকের মধ্যে চমকে উঠলো, পরে একটু সামনে তাকিয়ে দেখি ও একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে কথা বলছে।

saint martin island social work

আমার কৌতহলি চোখ সেখানে আটকে গেল। দেখছিলাম মেয়েটির সাথে সুফিয়া একটা বন্ধুতপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছে। একসাথে হাত ধরে মেয়েটার সাথে হাঁটছিল। দূর থেকে মনে হচ্ছিল ওরা একজন অন্যজনের পূর্ব পরিচিত।

আমি কাছে গিয়ে সুফিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম কে এই মেয়ে? তুমি কি তাকে চিন? সুফিয়া বললো না আমি ওকে আগে থেকে চিনিনা এখানেই পরিচয়।

ওর নাম নাজমা ও এখানকার স্থানীয়। নাজমা শামুকের ব্যস্লেট বানিয়ে বিক্রি করে। আগে ও এই কাজ করতো না শুধু পড়ালেখা করতো। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারের অভাব অনটনের কারণে বাধ্য হয়ে এ আয়ের পথ বেছে নিতে হয় তাঁকে। সুফিয়ার কাছে টাকা ছিল না তাই  সে ঐ ব্যস্লেট কিনতে পারেনি। আমি নাজমার কাছ থেকে ১০ টাকা দিয়ে একটি ব্যস্লেট কিনলাম।

নাজমাকে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার কয়টা ব্যস্লেট বিক্রি হয়েছে।

ভাইয়া আপনারটা দিয়ে তিনটা বিক্রি হয়েছে।

আর তোমার কাছে আছে কয়টা ব্যস্লেট আছে নাজমা।

৮টা ব্যস্লেট আছে ভাইয়া।

আমি ভাবলাম ওকে একটু সহযোগিতা করি। ওর এই ব্যস্লেটগুলো বিক্রি করে দেই। যথারীতি আমার অবিবাহিত সহকর্মীদের উৎসাহিত করি ব্যস্লেট কিনতে এবং অনেকে আমার কাছ থেকে ব্যস্লেট কিনে। বাকি ছিল দুইটা যেটা ট্যুর ম্যানেজার যুবায়ের ভাইয়ের কাছে বিক্রি করা হয়।

saint martin island social work

নাজমা বললো ভাইয়া আজকে সবচেয়ে বেশি টাকার ব্যস্লেট বিক্রি হয়েছে,  ১১০ টাকার। অন্যদিন গুলোতে ৫০ থেকে ৭০ টাকা হয়ে থাকে।

আমি মনে মনে একটু খুশি হলাম যাক আমরা অন্তত পক্ষে কিছুটা তো সহযোগিতা করতে পেরেছি নাজমাকে। এখানে অনেকে ঘুরতে এসেছে কিন্তু নাজমার জন্য এতটুকু সহানুভূতি দেখায়নি কেউ।

গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো……

কিন্তু গল্পটা শুরু হয় এখান থেকেই। আমি বললাম নাজমা আমরা তোমাদের বাসায় যাবো। তোমার আম্মার সাথে দেখা করবো। আমি তো ভেবেছিলাম নাজমা হয়তো এতে সম্মত হবে না। কিন্তু আমার ধারনা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমানিত করে মুচকি হেসে স্বাদর আমন্ত্রণ জানালো ভাইয়া সত্যিই জাবেন, তাহলে চলেন। আপনাদের রিসোর্ট যে রাস্তায় ঐ রাস্তায় আমাদের বাসা।

আমরা বললাম আচ্ছা ঠিক আছে। একটু পরে যাবো এখান থেকে,  তুমি কি এই সময়টুকু আমাদের সাথে থাকবে। নাজমা বললো ভাইয়া থাকবো। বীচের পাশে হুমায়ন আহামেদের সুমুদ্র বিলাস বাসার সামনে তার মামার দোকানে নিয়ে গেল এবং আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। আমাদের জোয়ার ভাটার বিষয়ে অনেক তথ্য দিল।

saint martin island social work

এবার আমরা সবাই রওনা হলাম  নাজমার সাথে ওর বাসার উদ্দেশ্যে। বীচ থেকে ২০ মিনিট হেঁটে নাজমার বাসায় পৌছালাম। আমাদের টিমের প্রায় সবাই নাজমার বাসায় গিয়েছিলো। নাজমার চাচা, বড় ভাই ও তার আম্মা বাসাতেই ছিলেন। তাদের সাথে নাজমার পড়ালেখা এবং নাজমার বাবা মারা যাবার পর তাদের সংসার কিভাবে চলছে, তাদের বর্তমান আয়ের উৎস কি? এগুলো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করছিলাম।

নাজমার মায়ের আঞ্চলিক ভাষা বুঝতে আমাদের অনেক অসুবিধা হচ্ছিল,  সেটা দেখে নাজমা আমাদের ভাষায় সেগুলো অনুবাদ করে দিচ্ছিল।

একি ভাষা কিন্তু আঞ্চলিকতার কারণে বুঝতে অসুবিধা হলে যেটা হয় আরকি। আমাদের সবাইকে চা দিয়ে অ্যাপায়ন করলো। তাদের অথিতি অ্যাপায়নের আন্তরিকতা দেখে সত্যিই আমরা মুগ্ধ। তাদের সংসারের কষ্টের কথাগুলো শুনে যদিও আমরা অনেক কষ্ট পেয়েছি।

এ কথা আবারও সত্য প্রমানিত হল “গরীবের অর্থ না থাকতে পারে, কিন্তু মনটা ওদের অনেক বড় যা এই ইট পাথরের মানুষের মধ্যে নেই “

নাজমার বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় আসতে আসতে চিন্তা করছিলাম আমরা সবাই যে, ওদের জন্য কি করা যায় বা কিভাবে আমরা সহযোগিতা করতে পারি? স্বপন ভাই, যুবায়ের ভাই, রাশেদ ভাই এবং রায়হান ভাইয়ের সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো।

এই আলোচনার মধ্যে স্বপন ভাই একটা বিষয় তুলে ধরে, আচ্ছা এরা এখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক না হয় পাশ করলো কিন্তু  পরবর্তী স্টেপে তারা কোথায় যায়? আমরা যদি ঐ বিষয়ে তথ্য পেতাম তাহলে একটু বড় পরিসরে সহযোগিতা করতে পারতাম। ওদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে যদি আমরা সহযোগিতা করতে পারতাম তাহলে ওইটা অনেক বড় হেল্প হত।

এই বিষয়গুলো মাথায় আসে নাজমার বড় ভাইয়ের কথা ভেবে ও এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে টেকনাফ থেকে।

আমি নাজমার টেবিলে বই দেখতে পেলাম কিন্তু কোন খাতা কলম দেখতে পেলাম না, যে খাতাটা ছিল সেটার পাতা শেষ। আমি আমার টিমকে অবহিত করি যে নাজমাকে আমরা খাতা এবং কলম দিয়ে সহায়তা করতে পারি এই মুহূর্তে। রাসেদ ভাই নাজমার খাতা কিনে দিতে ফান্ডিং করতে ইচ্ছুক হলেন আর আমি কলম কিনে দিতে ইচ্ছুক হলাম।

আমাদের মোটামুটি প্রাথমিক প্লান এটাই ছিল।

কিন্তু সিধান্ত পরিবর্তন হল সুফিয়ার কথা শুনে।  নাজমা সুফিয়ার সাথে শেয়ার করেছে আপা প্রাইমারি স্কুল শেষ করার পর সেন্ট মার্টিন বি এন ইসলামিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ওদের ভর্তি নিবে না।

saint martin island social work

এখানে একটা হাই স্কুল থাকতে কেন ভর্তি নিবে না এটার কারণ কি? সুফিয়াকে নাজমা বলেছে  আমরা গরীব দেখে এই স্কুলে আমরা পড়তে পারবো না। আমি কথাটা শুনে অবাক বিস্মিত হলাম! আমি শ্রেণী বৈষম্যর কথা সামাজিক বিজ্ঞান বইতে পরেছিলাম। কিন্তু এটা তো তার বাস্তব উদাহরন পেয়ে গেলাম।

বিষয়টা  এতক্ষণ শুধু নাজমা কেন্দ্রিক ছিল এখন পুরো সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অসহায় মানুষের কথা চিন্তা হল। আমরা চিন্তা করলাম এটা নিয়ে কিছু করা দরকার। এর জন্য আমাদের স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু মানুষের সহযোগিতার প্রয়োজন অনুভব করলাম।

সেই রাতে টিমের সবাই অস্পস্ট কষ্ট নিয়ে রাতে ঘুমাতে যায়। আমি টিম ম্যানেজার যুবায়ের ভাইকে বলি আমরা সামাজিক কাজ ও করবো পাশাপাশি আমাদের ট্যুর এর যে শিডিউল আছে সেগুলো যেন মিস না হয়। যুবায়ের ভাই বিষয়টা নিয়ে আমার সাথে একমত। আমি যুবায়ের ভাইকে বললাম আপনি ট্যুর শিডিউল এর বিষয়ে নজর দেন, আমি স্কুলের বিষয়টা দেখছি।

পরের দিন আমি আর সুফিয়া নাজমার জন্য খাতা কিনতে বাজরে গেলাম। এক বয়স্ক চাচার দোকান থেকে খাতা এবং কলম কিনছিলাম। চাচা আমাদের জিজ্ঞাসা করলো এতগুলো খাতা এবং কলম দিয়ে কি করবা? তোমরা তো এখানে ঘুরতে আসছো। তখন চাচাকে নাজমার কথা খুলে বললাম। চাচা নাজমাকে চিনতে পারলেন এবং তার বাবার হটাত মৃত্যুর কথা আমাদের জানালেন।

চাচার কাছে স্কুলের হেড মাস্টার এবং এখানকার চেয়ারম্যান এর বিষয়ে জানতে চাইলাম। চাচা বললেন আমার দোকানের দুই দোকান পরে চেয়ারম্যানের কার্যালয়। চেয়ারম্যান স্কুল কমিটির সভাপতি। উনি তোমাদের  এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন।

আমি আর সুফিয়া খাতা কিনা শেষে চেয়ারম্যান এর কার্যালয়ে উপস্থিত হলাম।  আমাদের পরিচয় দিলাম। আমরা কি করতে চাই সে বিষয়ে তাকে অবহিত করলাম। স্কুলের হেডমাস্টারের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে বললাম। যাতে আমরা এই স্কুলের বাচ্চাদের শিক্ষার বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারি।

শ্রেণী বৈষম্যর বিষয়ে চেয়ারম্যান এর সাথে কোন কথা বলিনি কারণ উনিও তো এই চক্রের মধ্যে রয়েছেন। তবে একটি বিষয় খুব ভালো লেগেছে উনি আমাদের কথাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে হেডমাস্টারের সাথে কথা বলে একটা শিডিউলের ব্যবস্থা করে দেন। এবং নিজে সেই আলোচনায় উপস্থিত থাকবেন বলে কথা দেন। সেখানে পরিচয় হয় মেম্বার হাবিব ভাইয়ের সাথে তার কাছ থেকে অনেক তথ্য পেলাম তার মাধ্যমে জানতে পারলাম সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ৩১০০ ভোটার, ৬টি ওয়ার্ডে বিভক্ত এই ইউনিয়ন।

তার এই তথ্য আমাকে বিস্মিত করে, এতটুকু ছোট্ট একটা দ্বীপে এত মানুষের বসবাস! হাবিব ভাইয়ের সাথে কথা শেষ করে আমরা ফিরে আসি রিসোর্টে। সুখবরটি যানাই টিমের অন্যসব সদস্যদের। সবাই খুব এক্সাইটেড হয় মিটিং এর বিষয়ে।

রাতে স্বপন ভাই সবাইকে একত্রিত করেন আড্ডা দেওয়ার জন্য।  আমি আর সুফিয়া ঘুমিয়ে পরেছিলাম তাই কেউ ডাকেনি। আমাদের অনুপস্থিতিতেই শুরু হয় আড্ডার সেশন। আড্ডা দেওয়ার এক ফাঁকে স্বপন ভাই মিটিং এর বিষয়টি সবার সামনে তুলে ধরে। সেখানে আমরা কি ধরনের সহযোগিতা করতে পারি, মিটিং  এ কোন কোন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে ইত্যাদি। পাশ থেকে এক ভাই, স্বপন ভাইকে বিব্রতকর ও ডিমোটিভেট করার জন্য এটার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের যুক্তি তুলে ধরেন। আসলে ভালো কাজ করতে গেলে এ রকম কিছু মানুষ থাকে যারা সব সময় পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখে। নিজে তো ভালো কাজে অংশগ্রহণ করবেই না, অন্য কাউকে করতে দিবে না। এই সমস্ত মানুষের জন্য ভালো কাজ করতে যেয়েও অনেকে পিছিয়ে পরে। আমাদের ট্যুর টিম লিডার যুবায়ের ভাই বিষয়টাকে সুন্দর করে সমাপ্ত করেন।

সকাল ১০টায় আমাদের মিটিং স্কুলে। আমি ৯ঃ১৫ মিনিট এর দিকে সবাইকে একবার স্বরন করিয়ে দেই মিটিং এর কথা। কিন্তু রাতে যে উদ্দীপনা দেখেছিলাম সবার মধ্যে মিটিং এর বিষয়ে, সকালে সেটা আর কারো মধ্যে দেখতে পারছি না।

বিষয়টা আমি বুঝতে পারছিলাম না, কি হয়েছে টিমের মধ্যে। স্বপন ভাইকে আলাদাভাবে ডেকে জিজ্ঞাসা করি কোন সমস্যা হয়েছিল কি রাতে। সবাই মিটিং এর বিষয়ে এত উদাসীন কেন? স্বপন ভাই রাতের বিষয়টা আমাকে খুলে বললেন। আমি আমার সামাজিক কাজের দশ বছরের অভিজ্ঞতায় একটা জিনিস শিখেছি। যে কোন ভালো কাজে যাবার পূর্বে অনেক বাঁধা আসে কিন্তু একবার কাজটি শুরু হয়ে গেলে আর কোন বাঁধাই থাকে না। মহান সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক রহমত নাজিল হয় যায় সেই কাজে।

saint martin island social work

৯ঃ৩০ মিনিটে আমরা রওনা হলাম স্কুলের দিকে। আল্লাহর রহমতে কয়েকজন ছাড়া আমরা সবাই উপস্থিত ছিলাম সেই মিটিং এ।

মিটিং এ উপস্থিত ছিলেনঃ

১। সেন্ট মার্টিন বি এন ইসলামিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক মহাদয়

২। এক্সট্রিম ট্রাভেলারস  এর সদস্যবৃন্দ

৩। মেম্বার হাবিব ভাই।

চেয়ারম্যান সাহেব এক সালিশে ছিলেন তাই আসতে পারেননি। কিন্তু তিনি ফোনের মাধ্যমে আমাদের মিটিং এ উপস্থিত থেকেছেন।

 

এ মিটিং থেকে সেন্ট মার্টিন বি এন ইসলামিক উচ্চ বিদ্যালয় কি সুবিধা পেল? 

১। যেহেতু এই স্কুলে প্রজেক্টর এবং ল্যাপটপ আছে। ঢাকা থেকে আমরা এই স্কুলের বাচ্চাদের আলোকে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষণীয় ডিজিটাল ভিডিও কন্টেন্ট পাঠাবো। যেটা বিশ্বায়নের যুগে তাদের এগিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।

২। এই স্কুলের শিক্ষকদের কম্পিউটার নলেজ বৃদ্ধির লক্ষে প্রতি বছর একটা ট্রেনিং সেশন ব্যবস্থা করা। সেটা অনলাইন অথবা ফিজিক্যালি হতে পারে।

৩। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যে সমস্ত দেশি পর্যটক বেরাতে আসেন বা আমাদের পরিচিত যারা আসবেন তাদের যে যে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা আছে সেই বিষয়ে এই বাচ্চাদের একটা বাস্তব সম্মত ধরানা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এই সমস্ত অভিজ্ঞ মানুষদের এই স্কুলে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া।

৪। যে সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা এই স্কুল থেকে পাশ করে কলেজে উঠবে, তাদের পরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সহায়তা করা।

৫। যারা অতি দরিদ্র, যাদের খাতা কলম ও শিক্ষা উপকরন কেনার মত সামর্থ্য নাই তাদেরকে সহযোগিতা করা।

saint martin island social work

নাজমা কি পেল?

১। নাজমা শিক্ষা উপকরন পেল।

২। এই স্কুলে ভর্তির নিশ্চয়তা।

৩। একজন ফিক্সড ডোনার, যে নাজমার খাতা কলম সহ শিক্ষা উপকরন দিবেন। যতদিন সে পড়ালেখা করবে।

৪। নাজমার সাথে যোগাযোগ হবে আমাদের তার বড় ভাই সৈয়দ আলীর মাধ্যমে।

 

saint martin island social work

এক্সট্রিম ট্রাভেলারস  এর সদস্যবৃন্দ কি পেল?

১। সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সৌন্দর্য দেখতে পেল।

২। ভালো কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারলো।

৩। শ্রেণী বৈষম্য কেমন হয় সেটা প্রত্যক্ষ করলো।

৪। নাজমার লাইফ থেকে শিক্ষা নিয়ে, আমি অনেক ভালো আছি এই মন্ত্রে বিশ্বাস সৃষ্টি।

৫।  অন্যদের ভালো কাজ দেখে নিজেকে ভালো কাজে সম্পৃক্ত থাকার সৎ ইচ্ছা পোষণ।

৬। নতুন ট্যুরে ভালো কাজ করার আগাম বাসনা।

 

গল্প তো এখানেই শেষ হওয়ার কথা, কিন্তু গল্পের নায়কের তো আবির্ভাব হল না। যদি ভেবে থাকেন আমি, যুবায়ের ভাই এবং স্বপন ভাইয়ের মধ্যে কেউ একজন হয়তো এই গল্পের নায়ক হবে। কিন্তু আমি সবাইকে দৃঢ় ভাবে বলতে চাই গল্পের নায়ক আমরা কেউ নই। গল্পের নায়ক নিচের ছবির এই ছেলেটা।

saint martin island social work

ওর নাম শ্যামল।  আমি জানি সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন জাগছে ও কিভাবে নায়ক হয়। গল্পে যার কোন রোল ছিল না।

শ্যামল এবং হাসান এর কথোপকথন গুলো একটু পড়ুন

শ্যামলঃ হাসান ভাই আপনার কি একটু সময় হবে? একটু কথা বলতাম।

হাসানঃ হ্যাঁ বল শ্যামল কি বলবে। আমার সময় হবে।

শ্যামলঃ ভাই আপনি তো জানেন আমি খুব একটা ভালো করে কথা বলতে পারি না। কোথায় কোন কথা বলতে হয় আপনাদের মত অত ভালো বুঝিনা। তাই আপনাদের সাথে যাইনি।

হাসানঃ তাতে কি হয়েছে। তুমি তো সবসময় আমাদের ভালো কাজকে সমর্থন দিয়েছ।

শ্যামলঃ ভাই সমর্থন দিয়েছি কিন্তু কখনো অংশগ্রহণ করিনি। কিন্তু এখন আমি  অংশগ্রহণ করতে চাই। আমিও আপনাদের মত ভালো কাজগুলোতে অংশগ্রহণ করতে চাই।

হাসানঃ আলহামদুলিল্লাহ্‌ এটা তো খুবই ভালো কথা।

শ্যামলঃ ভাই আমি প্রতিমাসে আমার বেতন থেকে ৫০০ পারি / ১০০০ পারি সাহায্য করতে চাই। আগে তো সেলরি অনেক কম পেতাম যা দিয়ে আমার নিজেরি চলতো না। এখন আল্লাহর রহমতে সমস্যা হয়না।

হাসানঃ শ্যামল তুমি কি নাজমার পড়ালেখার জন্য খাতা কলম সহ আনুষঙ্গিক খরচ বহন করবে। সেটা ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে থাকবে। শ্যামল মুখে এক স্বস্তির হাসি, যে হাসিটার অর্থ বোঝার ক্ষমতা হয়তো বিধাতা আমাকে দেয়নি। তবে মন থেকে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছিল।

 

চলতে থাকবে এখনো শেষ হয়নি গল্প