আমি অনেকের মুখে বলতে শুনেছি –

⇒ আমার কমিউনিকেশন স্কিল ভালো না।
⇒ আমি কারো সাথে মিশতে পারি না।
⇒ কেউ আমার বন্ধু হতে চায় না।
⇒ ক্লাইন্টের সাথে আমি ভালো কনভারসেশন করতে পারিনা।
⇒ অফিস কলিগদের সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে পারছি না।
⇒ নতুন অফিসে কেউ আমার সাথে ঠিকভাবে কথা বলতে চাচ্ছে না।
⇒ পুরানো বন্ধুদের সাথে আমার আগের মত ভালো কানেকশন নেই।
⇒ আমার আত্মীয় স্বজনদের সাথে সম্পর্ক ভালো না।

এই ধরণের আরও অনেক সমস্যার কথা শুনেছি। কিন্তু সমাধান দিতে পারিনি, পরামর্শ দিয়েই ক্ষান্ত থেকেছি।

এই সমস্যাগুলো সমাধান করা কি সম্ভব?

যদি সম্ভব হয় তাহলে সেটা কিভাবে?

আমি বিশ্বাস করি, নিচের চারটি শব্দের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব।
  • Communication (কমিউনিকেশন) = যোগাযোগ / আদান-প্রদান
  • Conversation (কনভারসেশন) = কথোপকথন / আলাপ করা / গল্পকরা
  • Contribution (কন্ট্রিবিউশন) = অবদান / অবদান রাখা
  • Connection (কানেকশন) = সংযোগ / সম্পর্ক
এই চারটা শব্দকে যদি ক্রমান্বয়ে সাজাই, তাহলে দাঁড়ায়-

Communication + Conversation + Contribution = Connection

যোগাযোগ করুন + আলাপ করুন + অবদান রাখুন = নতুন সম্পর্ক তৈরি করুন।

এই শব্দগুলোকে যদি একটা পূর্ণ বাক্যের মাধ্যমে প্রকাশ করি, তাহলে দাঁড়ায়-

যোগাযোগ করে আলাপ করার মাধ্যমে শ্রোতার জীবনে আপনার অবদান কি হতে পারে সেটা তুলে ধরুন এবং নতুন বন্ধুত্ব তৈরি করুন।

এই একটি বাক্যের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে, আপনি তৈরি করতে পারবেন নতুন বন্ধু। অফিস কলিগরা হয়ে উঠবে আপানর বন্ধু। ক্লাইন্ট আপনার কথাকে গুরুত্ব দিবে। আত্মীয় স্বজনদের সাথে সম্পর্ক থাকবে অটুট।

আমার খুব কাছের দুই বন্ধুর জীবন থেকে উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিস্কার করার চেষ্টা করছি

প্রথম বন্ধুর গল্প – কমিউনিকেশন ও কনভারসেশন অনুসন্ধান

আমার এক বন্ধু রেজাউল (ছদ্দনাম) শেয়ার বাজার এর বিজনেস করতো। অনেকের কাছ থেকেই শুনেছি ও নাকি শেয়ার ব্যবসাটা অনেক ভালো বুঝে। অনেকে নাকি ওর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে শেয়ার ব্যবসায় ইনভেস্ট করতো। তিন বছর আগে অন্য এক বন্ধুর মুখ থেকে শুনলাম। রেজাউল নাকি শেয়ার ব্যবসায় অনেক লস করেছে। ব্যাংক থেকে লোন তুলেছিল। সেটা পরিশোধ করার জন্য বাড়ির যে জমি ছিল সব বিক্রি করতে হয়েছে। এখন সে সর্বস্বান্ত। শুনে অনেক খারাপ লেগেছিল। পরে রেজাউল এর সাথে অনেক যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তার সাথে কোন ভাবেই যোগাযোগ করতে পারিনি। রেজাউল এর সন্ধান পরে আর আমাকে কেউ দিতে পারেনি।

গত বছর উত্তরায় এক সেমিনারে গিয়েছিলাম। সেমিনারে চা পানের বিরতির সময়, হঠাৎ রেজাউল এর সাথে দেখা। কোট-টাই পরিহিত একজন সুদর্শন যুবক। আমাকে দেখার সাথে সাথে মুচকি হেসে হাতটি বাড়িয়ে দিল, বললো বন্ধু কেমন আছিস? আমি তো ওকে দেখে পুরাই হতভম্ব হয়ে গেলাম। একি রেজাউলকে তো চেনাই যাচ্ছে না।

সেমিনার শেষে আমরা একটা কফিশপে বসলাম। অনেক আড্ডা হলো। আমি এক ফাঁকে শেয়ার বাজারের কথা তুললাম। সেই অবস্থা থেকে কিভাবে সে পরিত্রাণ পেল, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। সে তার ঘুরে দাঁড়ানোর পুরো বিষয়টা আমাকে খুলে বললো। আমি অবাক হয়ে ওর কথাগুলো শুনছি।

রেজাউল বর্তমানে একটি স্বনামধন্য কর্পোরেট অফিসের সহকারী ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত আছে। মাত্র তিন বছরে ওর ঘুরে দাঁড়ানোটা সত্যিই আমাকে অনেক অবাক করেছে।

রেজাউল এর কথার মধ্যে কয়েকটি পয়েন্ট আমি নোট করে রাখলাম।

রেজাউল বলছিলো,আমি যখন সব হারিয়ে নিঃস্ব। তখন আমার পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। কেউ আমাকে একটু সাহায্য পর্যন্ত করেনি। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এই নেটওয়ার্ক/পরিচিতজন থেকে বের হতে হবে। সম্পূর্ণ একটা নতুন নেটওয়ার্কে আমাকে যুক্ত হতে হবে। কারন এই নেটওয়ার্কের সবাই জানে আমি নিঃস্ব। আমার কাছ থেকে ওরা কিছুই পাবে না। আমি সবার কাছে করুনার পাত্র হয়ে থাকতে পারবোনা।

আমি প্রশ্ন করেছিলাম রেজাউলকে নতুন নেটওয়ার্কে তুই সংযুক্ত হলি কিভাবে?

রেজাউল বললো, আমি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম চলে যাই। ওখানে আমার বাল্যকালের এক বন্ধু থাকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়ালেখা করেছে, ওখানেই একটা কর্পোরেট অফিসে এইচআর ম্যানেজার হিসাবে কাজ করছিল। বন্ধু আমাকে তার অফিসে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেয়। এর মাধ্যমে আমি একটা কর্পোরেট নেটওয়ার্কের মধ্যে প্রবেশ করি।

ঐ নেটওয়ার্কে তুই এত বন্ধুত্ব কিভাবে তৈরি করলি? ঢাকায় এই চাকরিটা কিভাবে পেলি?

রেজাউল বললো, আমি বিভিন্ন ধরণের কর্পোরেট পার্টিতে অংশগ্রহণ করতাম। বেশ অনেক নামি দামি ব্যক্তিদের সাথে পরিচিত হই। আমার নিজের স্বার্থেই আমাকে এটা করতে হয়। প্রথমে আমি তাদের সাথে কুশল বিনিময় করতাম, তারপর খোশ গল্প জমাতাম। পরে সময়মত ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে রাখতাম। তাদের সাথে মাঝে মাঝে ফোনে আলাপ করতাম। কখনো কখনো দেখাও করে আড্ডা দিতাম। এভাবে ওখানে সবার সাথে আমার একটা ভালো রিলেশন তৈরি হয়ে যায়। এর মাধ্যমে আমার সম্পূর্ণ নতুন একটা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়ে যায়। পরে ঐ নেটওয়ার্কের এক বড়ভাই এর রেফারেন্সে ঢাকার এই কর্পোরেট অফিসে সহকারী ম্যানেজার হিসাবে জয়েন করি গত মাসে।

রেজাউলের সাথে আড্ডার কথাগুলোকে যদি আমি সারমর্ম আকারে সাজাই, তাহলে দাঁড়ায়-

কমিউনিকেশন + কনভারসেশন = কানেকশন

রেজাউল হয়তো কর্পোরেট ফিল্ডে আছে। ওখানকার কানেকশনের ধরণ হয়তো এ রকম। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে হয়তো আমার এই বন্ধুর উদাহরনটি যুক্তিযুক্ত হবে না। কারন একেকটি ফিল্ডে কমিউনিকেশন একেক ভাবে করতে হয়। এই উদাহরনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ সমাধান টা আসলো না। এখানে হয়তো ৬০% সমাধান এসেছে কিন্তু বাকি ৪০%  অনুসন্ধানে থাকলো-

দ্বিতীয় বন্ধুর গল্প – কন্ট্রিবিউশন অনুসন্ধান

আমার  স্কুল বন্ধু রিমন (ছদ্দনাম)। একজন আড্ডাবাজ এবং উদ্যোক্তা বন্ধু হিসাবে খ্যাত। স্কুলে থাকতে ও খুব ভালো সংগঠক ছিল। আমাদের ক্লাস ক্যাপটেন ও ছিল। এখন পর্যন্ত যত রিইউনিয়ন/ গেটটুগেদার হয়েছে সবগুলো ওর জন্য সম্ভব হয়েছে। আমাদের স্কুল বন্ধুদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে রিমনকে চিনে না। সবাই তার কথা শুনে এবং তাকে বন্ধুর যায়গা থেকে যথেষ্ট সম্মান করে।

ঢাকার মিরপুরে একদিন চায়ের আড্ডার ফাঁকে আমি রিমনকে, একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলাম?

তুই কোন উদ্যোগ নিলে সবাই সেই উদ্যোগে সারা দেয় কেন?

রিমন বললো, আমি তো অনেক আড্ডা প্রিয় একজন মানুষ। স্কুল লাইফে তোদের সাথে অনেক আড্ডা দিয়েছি, তাই তোরা আমাকে অনেক ভালোবাসিস। যদিও ঐ প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর আমি ওর কাছ থেকে পেলামনা। তবে এই আলোচনার মধ্যে, রিমন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দের ব্যবহার করেছিলো। আর সেই শব্দটা হল কন্ট্রিবিউশন।

এবার আমার চোখের পাতায় রিমনের কন্ট্রিবিউশনগুলো ফুটে উঠতে থাকলোঃ 
⇒ ক্লাসে কেউ যদি অংক ভালো না বুঝতো, স্যার ক্লাস থেকে চলে যাওয়ার পর রিমন তাকে অংক বুঝতে সাহায্য করতো।
⇒ ক্লাস ক্যাপ্টেন থাকা অবস্থায় যারা দুষ্টামি করতো তাদের নাম লিখে রাখতো ভয় দেখানোর জন্য কিন্তু স্যারকে সেটা দেখাত না।
⇒ ভালো ও খারাপ ছাত্রদের মাঝে ভেদাভেদ করতো না। সবাইকে সমান চোখে দেখাতো এবং সবার সাথে একই ভাবে আড্ডাবাজি করতো।

এরকম আরও অনেক কিছু। স্কুল জীবনে ও আমাদের ওর সময়টা কন্ট্রিবিট করেছিলো। তাই রিমনের সবার সাথেই ভালো কানেকশন আছে।

এবার আমার কনসেপ্টটা পুরো ক্লিয়ার হল। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে কন্ট্রিবিউশন শব্দটার অভাব ছিল।

এখন আমি যদি পুরো প্রক্রিয়াটাকে এক সাথে সাজাই, তাহলে দাঁড়ায়-

কমিউনিকেশন (কলেজ বন্ধু) + কনভারসেশন (কর্পোরেট বন্ধু) + কন্ট্রিবিউশন (স্কুল বন্ধু) = কানেকশন ( সফলতা / অর্জন / বন্ধুত্ব )

আপনি এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পারবেন। একটা ছোট উদাহরনের মাধ্যমে বিষয়টিকে বিস্তারিত বুঝানোর চেষ্টা করছি-

ধরুন আপনি একটি ট্র্যাভেল এজেন্সির কোন এজেন্ট এর সাথে বন্ধুত্ব করতে চান। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনি সেটা কিভাবে করবেন?

আপনি ভালো কোন একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে ভিজিট করুন। সেখানে গিয়ে খুঁজে বের করুন, আপনি কার সাথে বন্ধুত্ব করবেন। তার সাথে পরিচিত হন এবং তার সাথে আলাপে জানান আপনি ভ্রমন করতে পছন্দ করেন। ভ্রমন বিষয়ে আপনি তার কাছ থেকে পরামর্শ নিন। পরামর্শ নেওয়ার শেষে আপনি তার ভিজিটিং কার্ড নিন।
এটা ছিল একটি কমিনিকেশন এর উদাহরন

এবার আপনি তাকে ফোন করে কুশল বিনিময় করুন। সুযোগ বুঝে তাকে এক কাপ কফি খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ দিন। প্রথমে হয়তো রাজি হবে না। কিন্তু এভাবে কয়েকদিন রিকুয়েস্ট করলে, একদিন রাজি হয়ে যাবে। কফি পান করতে করতে খোশ গল্পের পাশাপাশি, আপনি আপানর স্কিল / সে আপনার কাছ থেকে কি কি সহযোগিতা পেতে পারে সে বিষয়ে ইনডাইরেক্টলি জানান। আপনি যদি একজন ওয়েব ডেভেলাপার হয়ে থাকেন। আপনি ভালো ওয়েব ডিজাইন করতে পারেন সেই বিষয়টি উপস্থাপন করবেন। কিন্তু সম্পর্কের শুরুতেই তাকে কখনো বলবেন না, আপনি তাকে ওয়েবসাইট বিষয়ে সহযোগিতা করবেন। এতে সে ভাবতে পারে আপনি তার কাছে মার্কেটিং করছেন। আপনার স্কিল এর বিষয়টা এর জন্য তাকে বলা, যাতে সে বুঝতে পারে আপনিও তাকে কোন বিষয়ে সহযোগিতা করার সক্ষমতা রাখেন। এতে সে আপনার সাথে কথা বলতে এবং পরবর্তীতে পুনঃরায় দেখা করতে উৎসাহবোধ করবে।
এটা ছিল একটি কনভারসেশন এর উদাহরন

একটা সময় পর উনার সাথে আপনার খুব ভালো সখ্যতা তৈরি হয়ে যাবে। একে অন্যকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে দ্বিধাবোধ করবেন না। একদিন ট্রাভেল এজেন্সি এর ঐ ভাইটি আপনাকে আমন্ত্রণ জানালেন কফি খাওয়ার জন্য। সে তার ট্রাভেল এজেন্সির জন্য একটি ওয়েবসাইট ডেভেলাপ করতে চান। সে জন্য আপনার কাছ থেকে ওয়েবসাইট ডিজাইনের বিষয়ে পরামর্শ চাইলেন। আপনি তাকে ওয়েবসাইট ডিজাইন বিষয়ে পরামর্শ দিলেন।
এটা ছিল একটি কন্ট্রিবিউশন এর উদাহরন

আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হওয়ায় ট্রাভেল এজেন্সির ঐ ভাইটির সাথে আপনার কানেকশন তৈরি হয়ে গেল।

আমি আসলে ট্রাভেল এজেন্সির ভাইটির সাথে কিভাবে সখ্যতা গড়ে তুলবেন সে বিষয়ে একটা উদারন দিয়েছি মাত্র। এই একই উদাহরন যে সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে একই ফলাফল পাবেন তেমনটা নয়। আপনাকে অবস্থা বুঝে বিভিন্ন ভাবে, নিজেকে উপস্থাপন করা লাগতে পারে। এটা আপনাকে সময় অবস্থা, স্থান, কাল ও পাত্র ঠিক করে দিবে।