খুব শিগ্রই আমরা একটা রবোটিক যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। যান্ত্রিক সেই যুগে থাকবে না কোন ভালোবাসা স্নেহবোধ, একে অন্যর প্রতি সম্মানবোধ, থাকবে না কোন কৃতজ্ঞতাবোধ। কারণ সেই সময় রোবটের সাথে চলতে চলতে মানুষ ও একটা যন্ত্র হয়ে পড়বে। আমরা সেই রবোটিক যুগের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে অবস্থান করছি।

আমার দাদার মুখে শুনেছি তার বাবারা নাকি জয়েন্ট পরিবার ছিলেন। একসাথে ৮০ থেকে ৯০ জনের খাবার রান্না করতে হত। সবাই মিলে একসাথে একি বাড়িতে থাকতেন সুখ-দুঃখগুলো একে অন্যের সাথে ভাগাভাগি করে নিতেন। এখন কার সময়ে এই কথাগুলো শুধু রূপকথার গল্প। আমরা এখন ছোট থেকে আরও অনেক ছোট পরিবারে রূপান্তরিত হচ্ছি। এখন তো অনেকে একা একা থাকতেই পছন্দ করছেন। যার ফলে পরিবার কেন্দ্রিক চিন্তাধারা পরিবর্তিত হয়ে ব্যক্তি কেন্দ্রিক স্বার্থতে রূপান্তরিত হচ্ছে।

যেখানে শুধু ব্যক্তি কেন্দ্রিক চিন্তা করা হয় সেখানে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় তো ঘটবেই। সেখানে তো কেউ কারো প্রতি সম্মান দিয়ে কথা বলবে না, একজনের বিপদে অন্যজন সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। এর জন্য আমাদের প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

আমি আমার জীবনের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। আমাকে প্রায় প্রতিদিন মিরপুর ৬ থেকে মিরপুর ১০ যেতে হয়। আমি রিক্সাতেই বেশির ভাগ সময় যাতায়াত করি। সেজন্য প্রতিদিন নতুন নতুন রিক্সাওলা ভাইদের রিক্সায় আমাকে চড়তে হত। আমি রিক্সায় চড়ে রিক্সাওলা ভাইদের সাথে খোশ গল্প করি। তার পরিবারের খোঁজ খবর নেই, সে কোন জেলা থেকে এসেছে? কোথায় থাকে?  রিক্সা কোথা হতে ভাড়া নেয়? ইত্যাদি আরও অনেক প্রশ্ন। আমি খুব খেয়াল করে দেখেছি যে রিক্সাওলা ভাইদের সাথে গল্প করতাম তাদের সাথে কখনো ভাড়া নিয়ে তর্ক হয়নি। সেই রিক্সাওলা ভাইয়েরাও কখন অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করেনি।

আমি এই বিষয়টা পুরো বোঝার জন্য টানা দশ দিন কোন রিক্সাওলা ভাইয়ের সাথে কোন খোশ গল্প করিনি। কোন কথাও বলিনি রিক্সায় উঠে গন্তব্যে পৌঁছাবার পর ভাড়া দিয়ে দিতাম। এই দশ দিনে দুই জন রিক্সাওলা আর পাঁচ টাকা এক্সট্রা ভাড়া দাবি করে বসে এবং দুজনেই পাঁচ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আমার কাছ থেকে আদায় করে নেয়।

এখানে পাঁচ টাকা বড় কথা নয়। ওরা চিন্তা করে এইসব বড়লোক মানুষের কাছ থেকে পাঁচ টাকা বেশি নিলে কি হবে? পাঁচ টাকা ওদের কাছে কিছুই না। আমরা তো আর চুরি করছি না শরীরের ঘাম ঝরিয়ে আয় করছি।

আমরা চিন্তা করি ভাড়া বেশি চাচ্ছে এই রিক্সাওলা। ব্যাটা একটা শয়তান, ফাজিল ইত্যাদি আরও কত কি? তারপর সারাদিনের যত রাগ অভিমান রিক্সাওলার উপর গিয়ে ঝাড়ি। অবশেষে পাঁচ টাকা অতিরিক্ত দিয়েও আসি।

এখানে রিক্সাওলার লাভ পাঁচ টাকা। আর আপনার লাভ একজনের উপরে রাগ অভিমানগুলো রিক্সাওলার উপর ঝেড়ে শান্তি।

এবার পুরো বিষয়টাকে একটু উল্টিয়ে ভাবি চলুন। আপনি সারাদিন অফিস করে অনেক ক্লান্ত সাথে বসের বকা, বউয়ের উপর অভিমান ইত্যাদি কত কিছু নিয়ে অফিস শেষে বাসায় ফিরছেন। একটা রিক্সাওলা ভাইয়ের সাথে আপনার দুঃখগুলো শেয়ার করে দেখুন সে সবসময় আপনার পক্ষই নিবে বসের পক্ষ নিবে না। আবার আপনাকে সান্ত্বনাও দিবে। আবার এটাও করতে পারেন রিক্সাওলা ভাইয়ের সুখ দুঃখগুলো শুনে নিজের সাথে তুলনা করবেন দেখবেন মনটা ভালো হয়ে যাবে। এই যে অল্প সময়ের মধ্যে আপনার যে পরিবর্তনটা আসলো এটাকেই আমি বলছি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। কারণ আপনি আপনার সমস্ত উঁচু নিচুর দেওয়াল ভেঙ্গে ঐ রিক্সাওলা ভাইয়ের সাথে মন খুলে কথা বলেছেন।

আমি যখনি রিক্সা থেকে নামি রিক্সাওলা ভাইকে সবসময় হাসিমুখে কৃতজ্ঞতার স্বরে বলি ধন্যবাদ ভাই অনেক কষ্ট করেলন। তারপর টাকাটা তার হাতে দেই। সেও হাসিমুখে আমার কাছ থেকে টাকাটা নেয়।

প্রতিদিন একি যায়গা থেকে রিক্সা চড়ার সুবাদে। অনেক রিক্সাওলা ভাইয়ের রিক্সায় একাধিক বার চড়া হয়েছে। আমিনুল ভাই নামে এক রিক্সাওলা ভাইয়ের রিক্সায় অনেকদিন চড়া হয়েছে আমার। তিনি আমাকে খুব ভালো করেই চিনেন। একদিন মিরপুর ১০ পৌঁছে তাকে ভাড়াটা বের করে দিতেই সে আমাকে বললো ” ভাই আপনাকে ধন্যবাদ আমার রিক্সায় চড়ার জন্য “ আমি আমিনুল ভাইয়ের মুখ থেকে এই কথাটা শোনায় অবাক হলাম। আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম ভাই ধন্যবাদ কেন? ধন্যবাদ তো আপনি পাবেন আমার কাছ থেকে আপনি কত কষ্ট করে নিয়ে আসলেন আমাকে। আমিনুল ভাই বললো ভাই বিনিময়ে তো আপনি আমাকে টাকা দিচ্ছেন। আপনি যদি আমার রিক্সায় না চড়তেন তাহলে আমি এই টাকাটা কিভাবে পেতাম? আর এই টাকা দিয়েই তো আমার পরিবার দু-বেলা দু-মুঠো ডাল ভাত খেতে পায়।

এটাই কৃতজ্ঞতাবোধ যেটা এখন নেই বললেই চলে। আমি সেই দিন থেকে সিধান্ত নেই যেকোন ছোট বড় কাজে কারো সহযোগিতা পেলে তাকে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাবো অর্থাৎ কৃতজ্ঞ থাকবো।

আমি নিজে চেষ্টা করবো ধন্যবাদ চর্চা করতে এবং অন্যকেও উৎসাহিত করবো। আমি বিশ্বাস করি ধন্যবাদ চর্চার মাধ্যমেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সূচনা হবে।